০ রফিকুল বাসার
জ্বালানি সংকট সত্ত্বেও কয়লা ব্যবহারের তেমন কোন উদ্যোগ নেই সরকারের। কয়লার বিশাল মজুদ রয়েছে অথচ জ্বালানি সংকটে দুর্ভোগ পোহাচ্ছে সাধারণ মানুষে। সরকারের কার্যকর উদ্যোগের অভাব এবং সিদ্ধান্তহীনতা দেশে এই সংকট তৈরি করেছে। এখনই উদ্যোগী না হলে ভবিষ্যতে সংকট বাড়বে। দেশীয় জ্বালানি ব্যবহার না করায় মানুষের জীবনযাত্রার খরচ বাড়ছে। বেশি বেশি জ্বালানি তেল আমদানি করতে হচ্ছে। আমদানি করা জ্বালানির উপর নির্ভরতার কারণে জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকিও বাড়ছে। জনসংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে যেভাবে চাহিদা বাড়ছে তাতে করে দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা করে গ্যাসের বিকল্প জ্বালানি নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক নূরুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, দেশে গ্যাসের ঘাটতি আছে। যা গ্যাস আছে তা হয়তো আরো কিছু তোলা যাবে। কিন্তু সেটা বিষয় নয়। দেশের উন্নতির জন্য জ্বালানি লাগবে। আমাদের জানা বিকল্প জ্বালানির মধ্যে আছে কয়লা। কয়লার ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে। জ্বালানি নিয়ে নিশ্চিত হতে গেলে কয়লার ব্যবহার বাড়াতে হবে। বাংলাদেশে যে কয়লা মজুদ আছে তা দিয়ে ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধিসহ ৫০ বছর জ্বালানি চাহিদা মেটানো সম্ভব। বর্তমানে জ্বালানি সম্পদের মধ্যে প্রাকৃতিক গ্যাস অন্যতম। বাণিজ্যিক জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৭৩ শতাংশ প্রাকৃতিক গ্যাস পূরণ করে। অন্যদিকে উৎপাদিত গ্যাসের প্রায় ৫০ শতাংশ বিদ্যুৎ ও প্রায় ১২ শতাংশ সার উৎপাদনে ব্যবহার হয়। দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন গ্যাসের উপর নির্ভরশীল। বর্তমানে জ্বালানি তেলের পুরাটা আমদানি করতে হয়। গ্যাসও ফুরিয়ে যাচ্ছে। আগামী ৫০ বছরে দেশে ৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) গ্যাসের প্রয়োজন হবে। বর্তমানে প্রমাণিত গ্যাস আছে প্রায় সাত টিসিএফ। কিছু দিন পরে গ্রামে রান্নার জন্য জ্বালানি কাঠেরও সংকট দেখা হবে। দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন (জিডিপি) বৃদ্ধির হার ৭ শতাংশ বা তার চেয়ে বেশি হলে ২০২৫ সাল পর্যন্ত কমপক্ষে ২৬ টিসিএফ অতিরিক্ত গ্যাসের প্রয়োজন হবে। যা আনুপাতিক হিসাবে প্রায় এক হাজার মিলিয়ন বা ১০০ কোটি টন কয়লার সমান। এ অবস্থায় দেশে উৎপাদিত সার, সিএনজি, আবাসিক জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্রে দীর্ঘমেয়াদে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য গ্যাস সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎসহ অন্যান্য খাতে গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে কয়লার ব্যবহার বাড়ানো উচিত। কয়লানীতি পর্যালোচনা কমিটি সরকারকে কয়েক বছর আগে গ্যাসের ব্যবহার কমানোর পরামর্শ দিয়েছে। বাংলাদেশে কয়লানীতি নেই। নীতি চূড়ান্ত করেই সে আলোকে কয়লা ব্যবহার করা হবে বলে সরকার ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু গত কয়েক সরকার চেষ্টা করেও কয়লানীতি করতে পারেনি। খসড়ানীতি পর্যালোচনা করার জন্য কয়েকবার কমিটি করা হয়েছে। তাদের সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হয়নি। বর্তমান সরকার এসেও প্রথমে কয়লানীতি আবার পর্যালোচনা করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু এখনো এ বিষয়ে কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। গত সপ্তাহে অর্থমন্ত্রী নিজে জ্বালানি বিভাগকে কয়লানীতি দ্রুত চূড়ান্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন। নিজস্ব কয়লা থাকা সত্ত্বেও সরকার আমদানি করা কয়লানির্ভর বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। এতে করে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বাড়বে। আর বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বাড়লে সাধারণ গ্রাহককে বাড়তি মূল্য শোধ করতে হবে। প্রতিবছর বাড়বে বিদ্যুতের দাম। একই অবস্থা হবে আমদানি করা জ্বালানি তেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ালে। এখনই জ্বালানি তেলের দাম শোধ করতে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (পিডিবি) মোটা অংকের ভর্তুকি গুনতে হচ্ছে। গ্যাস না থাকলেও কয়লার মজুদ আছে। আবিষ্কৃত কয়লা ক্ষেত্র আছে পাঁচটি। এরমধ্যে একটি থেকে কয়লা তোলা হচ্ছে। তাও এই কয়লা পুরোপুরি অর্থনৈতিকভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। দেশের কয়লা পুরোপুরি ব্যবহার করতে না পারলেও গত বছর কয়লা আমদানির উদ্যোগ নিয়েছিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। যদিও পরে এই উদ্যোগ বাতিল করা হয়। দেশের একমাত্র বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির উপর ভিত্তি করে ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। যদিও বছরের বেশিরভাগ সময় সে বিদ্যুৎ কেন্দ্র বিকল থাকায় গড়ে ১২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎও ঠিকমতো উৎপাদন হয় না। বড়পুকুরিয়ার কয়লা দিয়ে আরো বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। কিন্তু সে বিষয়েও কোন সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। বড়পুকুরিয়া কয়লা ক্ষেত্র থেকে গত মাসেও একদিনে পাঁচ হাজার টন কয়লা তোলা হয়েছে। বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে এ পর্যন্ত আবিষ্কার হওয়া বড়পুকুরিয়া, খালাশপীর, ফুলবাড়ি, জামালগঞ্জ ও দীঘিপাড়া এই পাঁচটি ক্ষেত্রে মজুদ আছে দুই হাজার ২২১ মিলিয়ন বা ২০২ কোটি টন কয়লা। জামালগঞ্জের গভীরতা বেশি বলে সেখান থেকে কয়লা তোলা সম্ভব নয়। জামালগঞ্জ বাদে অন্য চারটিতে মজুদ আছে এক হাজার ১৬৮ মিলিয়ন টন। সম্প্রতি জামালগঞ্জের কয়লা খনিতেই গ্যাসে রূপান্তর করে তোলা যায় কিনা তা পরীক্ষা করা হচ্ছে। বড়পুকুরিয়া (দিনাজপুর) ১১৮-৫০৯ মিটার গভীরে প্রমাণিত ৩০৩ টন কয়লা মজুদ আছে। সম্ভাব্য ও প্রমাণিত মজুদ আছে ৩৯০ টন। বার্ষিক ১০ লাখ টন কয়লা তোলার লক্ষ্য নিয়ে এই খনি থেকে এখন কয়লা তোলা হচ্ছে। খালাশপীর (রংপুর) খনিতে ২৫৭ থেকে ৪৮৩ মিটার গভীরে কয়লা আছে। এখানে মোট মজুদ ৬৮৫ টন। ফুলবাড়ি (দিনাজপুর) খনির গভীরতা ১৫০ থেকে ২৪০ মিটার। মজুদ ৫৭২ টন। জামালগঞ্জ (জয়পুরহাট) ৬৪০ থেকে ১১৫৮ মিটার গভীরে মজুদ আছে এক হাজার ৫৩ টন। দীঘিপাড়া (দিনাজপুর) খনির ৩২৮ থেকে ৪০৭ মিটার নিচে আছে মোট ৬০০ টন কয়লা। বিদ্যুৎ, সার, সিএনজি, কলকারখানা, বাণিজ্যিক ও আবাসিক প্রয়োজনে প্রতিদিন ২৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। কিন্তু সরবরাহ করা হচ্ছে গড়ে ১৯৬ কোটি ঘনফুট। এরমধ্যে জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে উত্তোলন করা হচ্ছে ৯২ কোটি ঘনফুট এবং বিদেশী কোম্পানি উত্তোলন করছে ১০৪ কোটি ঘনফুট গ্যাস। যথাসময়ে যথাযথ উদ্যোগের অভাবে ২০০৮ সাল থেকে তীব্র গ্যাস সংকট শুরু হয়। বর্তমান প্রমাণিত গ্যাস মজুদ দিয়ে ২০১১ সাল পর্যন্ত চলবে। তবে সম্ভাব্য মজুদ দিয়ে আরো চার বছর চালানো যাবে। অর্থাৎ ২০১৫ সাল পর্যন্ত গ্রাহকদের ঠিকমতো গ্যাস দিতে পারবে পেট্রোবাংলা। তবে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যদি শুধু গ্যাসের উপর নির্ভর হয়। এবং সেই অনুযায়ী যদি নতুন নতুন গ্যাস সংযোগ দেয়া হয় তবে ২০১৫ পর্যন্তও চলবে না। প্রমাণিত ১৫ টিসিএফ গ্যাসের মধ্যে ২০০৯ সালের জুন পর্যন্ত ৮ দশমিক ৩৭ টিসিএফ গ্যাস তোলা হয়েছে।
Source: http://ittefaq.com.bd/content/2010/04/05/news0052.htm
Filed under: Bangladesh | Leave a Comment »



